নিরুক্ত

আর কতদিন রবে নিরুক্ত তোমার মনের কথা?
কথা কও প্রিয়া, সহিতে নারি এ নিদারুণ নীরবতা।
কেবলই আড়াল টানিতে চাহ গো তোমার আমার মাঝে
সে কি লজ্জায়? তবে কেন তাহা অবহেলা সম বাজে?
হেরো গো আমার তৃষিত আকাশ তব অধরের কাছে
যে কথা শোনার তরে শত যুগ আনত হইয়া আছে,
বলো বলো প্রিয়া, সে কথা বলিবে কবে?
সে কথা শুনিয়া মাতিয়া উঠিবে আকাশ মহোৎসবে!
যে কথা কারেও বলনি জীবনে আমারেও নাহি বল,
যে কথার ভারে অসহ ব্যথায় টলিতেছে টলমল,
তোমার অধর-পল্লব ফাঁকে সেই নিরুক্ত বাণী –
ফুলের মতন ফুটিয়া উঠিবে কোন শুভক্ষণে, রানি?
না-বলা তোমার সে কথা শোনার লাগি
শত সে জনম কত গ্রহ তারা আড়ি পেতে আছে জাগি!
সে কথা না শুনে তিথি গুনে গুনে চাঁদ হয়ে যায় ক্ষয়,
শুনিবে আশায় লয় হয়ে চাঁদ আবার জনম লয়!
আমার মনের আঁধার বনের মৌনা শকুন্তলা,
কোন লজ্জায় কোন শঙ্কায়, যায় না সে কথা বলা?
তুমি না কহিলে কথা
মনে হয়, তুমি পুষ্পবিহীন কুন্ঠিতা বনলতা!
সে কথা কহিতে পার না বলিয়া বেদনায় অনুরাগে
তব অঙ্গের প্রতি পল্লবে ঘন শিহরন জাগে।
তোমার তনুর শিরায় শিরায় সে কথা কাঁদিয়ে ফিরে,
না-বলা সে কথা ঝরে ঝরে পড়ে তোমার অশ্রু-নীরে!
হে আমার চির-লজ্জিত বধূ, হেরো গো বাসরঘরে
প্রতীক্ষারত নিশি জেগে আছি সে কথা শোনার তরে।
হাত ধরে মোর রাত কেটে যায়, চরণ ধরিয়া সাধি,
অভিমানে কভু চলে যাই দূরে, কভু কাছে এসে কাঁদি।
তোমার বুকের পিঞ্জরে কাঁদে যে কথার কুহু-কেকা,
অধর-দুয়ার খুলিয়া কি তারা বাহিরে দেবে না দেখা?
আমার ভুবনে যত ফুল ফোটে রেখে তব রাঙা পায়
ফাগুনের হাওয়া উত্তর নাহি পেয়ে কেঁদে চলে যায়।
হে প্রিয় মোর নয়নের জ্যোতি নিষ্প্রভ হয়ে আসে,
ঘুম আসে না গো, বসে থাকি রাতে নিরুদ্ধ নিশ্বাসে।
বুঝি বলিতে পার না লাজে
মোর ভালোবাসা ভালো লাগে নাকো বেদনার মতো বাজে!
কহো সেই কথা কহো,
কেন বেদনার বোঝা বহ তুমি কেন আপনারে দহ?
আমি জানি মোর নিয়তির লেখা, – তবু সেই কথা বলো
‘ভিখারি, ভিক্ষা পেয়েছ, তোমার যাবার সময় হল!’
মুষ্টি-ভিক্ষা চাহিয়া ভিখারি দৃষ্টি-প্রসাদ পায়,
উৎপাত-সম তবু আসে, তারে ক্ষমা করো করুণায়!
কেন অপমান সহি নেমে আসি বিরহ যমুনাতীরে।
– রাগ করিয়ো না, হয়তো চিনিতে পারনি এ ভিখারিরে!
কী চেয়েছিনু, হয়তো বুঝিতে পারনিকো তুমি হায়,
তোমারে চাহিতে আসিনি, আমারে দিতে এসেছিনু পায়!
আমি বলেছিনু, ‘আমারে ভিক্ষা লইয়া বাঁচাও মোরে,
তুমি তা জান না, কত কাল আছি ভিক্ষা-পাত্র ধরে।’
আমি বলেছিনু, ‘ধরায় যখন চলিবে যে পথ দিয়া,
চরণ রেখো গো, সেই পথে আমি বুক পেতে দেব প্রিয়া!
তোমার চরণে দেখেছি যে বেদ-গানের নূপুর-পরা,
কত কাঁটা কত ধূলি ও পঙ্কে পৃথিবীর পথ ভরা
তাই শিবসম, হে শক্তি মম, তব পথে পড়ে থাকি,
তাই সাধ যায় গঙ্গার মতো জটায় লুকায়ে রাখি!’
চির-পবিত্রা অমৃতময়ী, বলো কোন অভিমানে
তোমার পরম-সুন্দরে ফেলি যাও শ্মশানের পানে?
আপন মায়ায় পরম শ্রীমতী চেন নাকো আপনারে,
কহিলে না কথা, নামায়ে আমার প্রেম-যমুনার পারে।
আমি যা জানি না, তুমি তাহা জান ভালো,
তুমি না কহিলে কথা, নিভে যায় বৃন্দাবনের আলো!
বক্ষ হইতে চরণ টানিয়া লইলে, ভিক্ষু শিব
মহারুদ্রের রূপে সংহার করিবে এ ত্রিদিব।
রহিবে না আর প্রিয়-ঘন মোর নওলকিশোর রূপ,
মহাভারতের কুরুক্ষত্রে দেখিবে শ্মশান-স্তূপ!
হে নিরুক্তা, সেদিন হয়তো শূন্য পরম ব্যোমে
শুনাতে চাহিবে তোমার না-বলা কথা তব প্রিয়তমে।
আসিবে কি তুমি বেণুকা হইয়া সেদিন অধরে মম?
এই বিরহের প্রলয়ের পারে
কোন অনাগত আরেক দ্বাপরে
লজ্জা ভুলিয়া কন্ঠ জড়ায়ে কহিবে কি – ‘প্রিয়তম!’

মোবারকবাদ

মোরা ফোটা ফুল, তোমরা মুকুল এসো গুল-মজলিশে
ঝরিবার আগে হেসে চলে যাব – তোমাদের সাথে মিশে।
মোরা কীটে-খাওয়া ফুলদল, তবু সাধ ছিল মনে কত–
সাজাইতে ওই মাটির দুনিয়া ফিরদৌসের মতো।
আমাদের সেই অপূর্ণ সাধ কিশোর-কিশোরী মিলে
পূর্ণ করিয়ো, বেহেশ্‌ত এনো দুনিয়ার মহফিলে।
মুসলিম হয়ে আল্লারে মোরা করিনিকো বিশ্বাস,
ইমান মোদের নষ্ট করেছে শয়তানি নিশ্বাস!
ভায়ে ভায়ে হানাহানি করিয়াছি, করিনি কিছুই ত্যাগ,
জীবনে মোদের জাগেনি কখনও বৃহতের অনুরাগ!

শহিদি-দর্জা চাহিনি আমরা, চাহিনি বীরের অসি,
চেয়েছি গোলামি, জাবর কেটেছি গোলামখানায় বসি।
তোমরা মুকুল, এই প্রার্থনা করো ফুটিবার আগে,
তোমাদের গায়ে যেন গোলামের ছোঁয়া জীবনে না লাগে।
গোলামের চেয়ে শহিদি-দর্জা অনেক ঊর্ধ্বে জেনো;
চাপরাশির ওই তকমার চেয়ে তলোয়ারে বড়ো মেনো!
আল্লার কাছে কখনও চেয়ো না ক্ষুদ্র জিনিস কিছু,
আল্লাহ্ ছাড়া কারও কাছে কভু শির করিয়ো না নিচু!
এক আল্লাহ্ ছাড়া কাহারও বান্দা হবে না, বলো,
দেখিবে তোমার প্রতাপে পৃথিবী করিতেছে টলমল!
আল্লারে বলো, ‘দুনিয়ায় যারা বড়ো, তার মতো করো,
কাহাকেও হাত ধরিতে দিয়ো না, তুমি শুধু হাত ধরো।’
এক আল্লারে ছাড়া পৃথিবীতে কোরো না কারেও ভয়
দেখিবে – অমনি প্রেমময় খোদা, ভয়ংকর সে নয়!
আল্লারে ভালোবাসিলে তিনিও ভালোবাসিবেন, দেখো!
দেখিবে সবাই তোমারে চাহিছে আল্লারে ধরে থেকো!

খোদার বাগিচা এই দুনিয়াতে তোমরা নব মুকুল,
একমাত্র সে আল্লাহ্ এই বাগিচার বুলবুল!
গোলামের ফুলদানিতে যদি এ মুকুলের ঠাঁই হয়,
আল্লার কৃপা-বঞ্চিত হব, পাব মোরা পরাজয়!
যে ছেলেমেয়ে এই দুনিয়ায় আজাদমুক্ত রহে,
তাহাদেরই শুধু এক আল্লার বান্দা ও বাঁদি কহে!
তারাই আনিবে জগতে আবার নতুন ঈদের চাঁদ,
তারাই ঘুচাবে দুনিয়ার যত দ্বন্দ্ব ও অবসাদ!
শুধু আরশের আতরদানিতে যাহাদের হয় ঠাঁই,
তোমাদের এই মহফিলে আমি সেই মুকুলেরে চাই!

সেই মুকুলেরা এসো মহফিলে, বসাও ফুলের হাট,
এই বাংলায় তোমরা আনিয়ো মুক্তির আরফাত।

শিখা

যৌবনের রাগ-রক্ত লেলিহান শিখা
জ্বলিয়া উঠিবে কবে ভারতে আবার
জড়তার ধূমপুঞ্জ বিদারণ করি
উদ্ভাসিয়া তমসার তিমির-শর্বরী?
কোথা সে অনাগত সাগ্নিক পুরোধা
নির্বাপিত-প্রায় এই যজ্ঞ হোমানলে
উচ্চারিয়া বেদমন্ত্র দানিবে আহুতি,
নব নব প্রাণের সমিধ কে জোগাবে সেথা?

হায় রে ভারত, হায় যৌবন তাহার
দাসত্ব করিতেছে অতীত জরার!
জরাগ্রস্ত বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধ জরদ্গব
দেখায়ে গলিত-মাংস চাকুরির মোহ
যৌবনের টিকা-পরা তরুণের দলে
আনিয়াছে একেবারে ভাগাড়ে শ্মশানে।
যৌবনে বাহন করি পঙ্গু জরা আজি
হইয়াছে ভারতে জনগণপতি!

যে হাতে পাইত শোভা খর তরবারি
সেই তরুণের হাতে ভোট-ভিক্ষা-ঝুলি
বাঁধিয়া দিয়াছে হায়! – রাজনীতি ইহা!
পলায়ে এসেছি আমি লজ্জায় দু-হাতে
নয়ন ঢাকিয়া! যৌবনের এ লাঞ্ছনা
দেখিবার আগে কেন মৃত্যু হইল না?

যৌবনের আবরণে ভারতে কি তবে
ফিরিতেছে দলে দলে বৃদ্ধ-প্রাণ জরা?
নহিলে এ সিন্ধবাদ কেমন করিয়া
ফিরিতেছে যৌবনের স্কন্ধে চড়ি আজও?

অতীতের অর্থ ভূত, সেই অদ-ভুত
অতীত কি বর্তমানে এখনও শাসিবে?
এই ভূতগ্রস্ত জাতি জানি না কেমনে
স্বাধীন হইবে কভু, পাইবে স্বরাজ!

রে তরুণ, তোমারে হেরিয়া আমি কাঁদি!
অসম্ভবের পথে অভিযান যার
সুদূর ভবিষ্যতে দুর্মদ দুর্বার
সে আজি অতীতে পানে মেলিয়া নয়ন
কেবলই পিছনে চলে, নেতার আদেশে।
তলোয়ার হইয়াছে লাঙলের ফলা!

তোমাদেরই মাঝে আছে নেতা তোমাদের,
তোমাদেরই বুকে জাগে নিত্য ভগবান,
ভয়হীন, দ্বিধাহীন, মৃত্যুহীন তিনি!
তোমারে আধার করি সেই মহাশক্তি
প্রকাশিতে চান নিত্য, চাহো আঁখি খুলি
আপনার মাঝে দেখো আপন স্বরূপ!

অতীতের দাসত্ব ভোলো! বৃদ্ধ সাবধানী
হইতে পারে না কভু তোমাদের নেতা।
তোমাদেরই মাঝে আছে বীর সব্যসাচী
আমি শুনিয়াছি বন্ধু সেই ঐশীবাণী
ঊর্ধ্ব হতে রুদ্র মোর নিত্য কহে হাঁকি,
শোনাতে এ কথা, এই তাঁহার আদেশ।

তোমাদের প্রাণের এ অনির্বাণ-শিখা
যৌবনের হোমকুণ্ড-পাশে বৃদ্ধ বসি,
আগুন পোহাবে, বন্ধু, এ দৃশ্য দেখিতে
যেন নাহি বাঁচি আর। সমাধি হইতে
আর যেন নাহি উঠি প্রলয়ের আগে!

সে যে আমি

ওগো দুরন্ত সুন্দর মোর! কার পরে রাগ করি
তারার মুক্তা-মালিকা ছিঁড়িয়া ছড়ালে গগন ভরি?
কারে তুমি ভালোবাস প্রিয়তম? কার নাহি পেয়ে দেখা
চাঁদের কপোলে মাখাইয়া দিলে কালো কলঙ্ক-লেখা?
কার অনুরাগ নাহি পেয়ে তুমি লাল হয়ে ওঠ রাগে?
প্রভাত-সূর্যে, সৃষ্টিতে সেই রাগের বহ্নি লাগে।
কাহার বিরহ-জ্বালায় জ্বালাও বিশ্ব, পরম স্বামী?
সে কি আমি? সে কি আমি?

বনে উপবনে কুঞ্জে ফোটাও চামেলি চম্পা হেনা,
ওগো সুন্দর, ফুল ফুটাইয়া মালা কেন গাঁথিলে না?
শ্রাবণ-গগনে মেঘরূপে ওঠে তব রোদনের ঢেউ,
ঝুরিয়া ঝুরিয়া ক্ষীণ হল তনু, ভালোবাসিল না কেউ?
ওগো অভিমানী! বলো, কেন কোন নির্দয় অভিমানে
সৃষ্টিতে দিয়া জীবন, আবার টানিছ মৃত্যু-টানে?
গড়িয়া নিমেষে ভেঙে ফেল রূপ, যেন ভালো নাহি লাগে
রূপের এ খেলা। কোন অপরূপা স্মৃতিতে তোমার জাগে।
তাহারই লাগিয়া জাগিয়া রয়েছ উদাসীন দিবাযামী,
সে কি আমি? সে কি আমি?
ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোমে বসালে ভূতের মেলা,
ভূত নিয়ে এ কী অদ্ভুত খেলা, কে হানিয়াছে হেলা?
মাধবীলতার কাঁকন পরায়ে সহকার-তরুশাখে
রুদ্র ঝড়ের রূপে এসে তুমি কেন ছিঁড়ে ফেল তাকে?
তোমার প্রেমের রাখি কে নিল না, কে সেই গরবিনি?
আজও সৃষ্টির পিত্রালয়ে কি কাঁদে সেই বিরহিণী?
তাই কি যেখানে মিলন, সেখানে নিত্য বিরহ আনো?
আপন প্রিয়ারে পেলে না বলিয়া সবার প্রিয়ারে টানো?
কার কামনার সৃষ্টিতে তব রূপ চঞ্চলকামী?
সে কি আমি? সে কি আমি?

কাহারে ভুলাতে ঝর অনন্ত পরম-শ্রীর রূপে,
তোমারই গুণের কথা কি ভ্রমর ফুলে কয় চুপে চুপে?
মুহু মুহু উহু উহু করে ওঠ কুহুর কন্ঠস্বরে
তোমারই কাছে কি শিখিয়া পাপিয়া পিয়া পিয়া রব করে?
পদ্মপাতার থালায় তোমার নিবেদিত ফুলগুলি
ঝরে ঝরে পড়ে অশ্রুসায়রে, কহ লইল না তুলি!
যাহার লাগিয়া ফুলের বক্ষে সঞ্চিত কর মধু,
সকলে সে মধু লইল, নিল না তোমারই মালিনীবধূ?
যে অপরূপারে খোঁজ অনন্তকাল রূপে রূপে নামি –
সে কি আমি? সে কি আমি?

সংহারে খোঁজ, সৃষ্টিতে খোঁজ, খোঁজ নিত্য স্থিতিতে,
যাহারে খুঁজিছ পরম বিরহে, খুঁজিছ পরম প্রীতিতে,
যে অপরূপা পূর্ণা হইয়া আজিও এল না বাহিরে
পাইয়া যাহারে বলিছ, এ নয়, হেথা নয় সে তো নাহি রে।
সেই কুন্ঠিতা গুন্ঠিতা তব চির-সঙ্গিনী বালিকা
অনন্ত প্রেমরূপে অনন্ত ভুবনে গাঁথিছে মালিকা।
ভীরু সে কিশোরী তব অন্তরে অন্তরতম কোণে
হারাবার ভয়ে তোমারে, লুকায়ে রহে সদা নিরজনে।
সকলেরে দেখ, আপনারে শুধু দেখ না পরম উদাসীন,
দেখিলে, দেখিতে যেখানে তুমি, সেইখানে সে যে আছে লীন!
যত কাঁদে, তত বুকে বাঁধে তোমারেই অন্তর্যামী!
সে কি আমি? সে কি আমি?

ওগো প্রিয়তম! যত ধরি আমি দু-হাতে তোমারে জড়ায়ে
আমারে খুঁজিতে আমারেই তত সৃষ্টিতে দাও ছড়ায়ে।
আমারে যতই প্রকাশিতে চাহ বাহিরে ভুবনে আনিয়া,
তত লুকাইতে চাহি ; আজিও যে আমি অপূর্ণা জানিয়া।
হে মোর পরম মনোহর ! তব প্রিয়া বলে দিতে পরিচয়,
ক্ষমা করো, যদি অপূর্ণা এই বালিকার মনে জাগে ভয়!
আমার কলহ মান-অভিমান তোমার সহিত গোপনে,
জাগ্রত দিনে আজও লাজ লাগে, তাই মিলি আমি স্বপনে।
ওগো ও পরম নিলাজ, পরম নিরাবরণ, হে চঞ্চল,
আমারে ধরিতে, টানিয়া চলেছ সৃষ্টিতে মোর অঞ্চল।
আমারে কাঁদাতে সকলের সাথে দেখাও মিলন-অভিনয়,
বাহিরে এনো না, কাঁদিব বক্ষে, রেখো এ মিনতি প্রেমময়।
যদি ভালো তুমি বাস অপরেরে, হে পর-পুরুষ সুন্দর,
আমি আছি, আমি রব চিরকাল জুড়িয়া তোমার অন্তর।
আমি যে তোমার শক্তি হে প্রিয়, প্রকাশ বহির্জগতে,
আমারে না পেয়ে দুঃখের রূপে কাঁদিছে স্বর্গে-মরতে।
কলঙ্ক দিয়া আমার ধর্মে কলঙ্কী নাম নিলে হে,
দুই হয়ে তব রটে অপযশ, একাকী তো বেশ ছিলে হে।
তব সুন্দর-ছায়া মায়া রচে, মায়াতীত হয়ে তাহাতে–
কেন আসক্ত হলে তুমি, তারে জড়ায়ে ধরিলে বাঁ হাতে?
রূপ নাই, তবু রূপের তৃষ্ণা কেন তব বুকে জাগে,
এত রূপ রসে ঝরিয়া পড়িছ বলো কার অনুরাগে?
খেলা-শেষে মহাপ্রলয়ের বেলা আমার দুয়ারে থামি
জানাবে পরম-পতি আমারে কি –
আমি, প্রিয়, সে যে আমি!

খোকার সাধ

আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি।
সূয্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে,
‘হয়নি সকাল, ঘুমো এখন’- মা বলবেন রেগে।
বলব আমি, ‘আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি সকাল- তাই বলে কি সকাল হবে না ক?
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!’
ঊষা দিদির ওঠার আগে উঠব পাহাড়-চূড়ে,
দেখব নিচে ঘুমায় শহর শীতের কাঁথা মুড়ে,
ঘুমায় সাগর বালুচরে নদীর মোহনায়,
বলব আমি ‘ভোর হল যে, সাগর ছুটে আয়!
ঝর্ণা মাসি বলবে হাসি’, ‘খোকন এলি নাকি?’
বলব আমি নই কো খোকন, ঘুম-জাগানো পাখি!’
ফুলের বনে ফুল ফোটাব, অন্ধকারে আলো,
সূয্যিমামা বলবে উঠে, ‘খোকন, ছিলে ভাল?’
বলব ‘মামা, কথা কওয়ার নাই ক সময় আর,
তোমার আলোর রথ চালিয়ে ভাঙ ঘুমের দ্বার।’
রবির আগে চলব আমি ঘুম-ভাঙা গান গেয়ে,
জাগবে সাগর, পাহাড় নদী, ঘুমের ছেলেমেয়ে!

উৎসর্গ (অগ্নিবীণা)

ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর
শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ
শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু
.

অগ্নি-ঋষি! অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজে।
তাই তো তোমার বহ্নি-রাগেও বেদন-বেহাগ বাজে॥
দহন-বনের গহন-চারী–
হায় ঋষি– কোন্ বংশীধারী
নিঙ্‌ড়ে আগুন আন্‌লে বারি
অগ্নি-মরুর মাঝে৷৷
সর্বনাশা কোন্ বাঁশি সে বুঝ্‌তে পারি না যে॥
.

দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হান্‌ছিলে বৈশাখে,
হঠাৎ সে কার শুন্‌লে বেণু কদম্বের ঐ শাখে।
বজ্রে তোমার বাজ্‌ল বাঁশি,
বহ্নি হলো কান্না হাসি,
সুরের ব্যথায় প্রাণ উদাসী–
মন সরে না কাজে।
তোমার নয়ন-ঝুরা অগ্নি-সুরেও রক্ত-শিখা বাজে॥

প্রলয়োল্লাস

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়।
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

আস্‌ছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙ্‌ল আগল।
      মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে
      মহাকালের চণ্ড-রূপে–
                ধূম্র-ধূপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আস্‌ছে ভয়ঙ্কর–
      ওরে ঐ হাস্‌ছে ভয়ঙ্কর!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
 

ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপ্‌টা মেরে গগন দুলায়,
সর্বনাশী জ্বালা-মুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!
      বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
      রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
                দোদুল্‌ দোলে!
অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর–
      ওরে ঐ স্তব্ধ চরাচর!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
 

দ্বাদশ রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন-কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!
      বিন্দু তাহার নয়ন-জলে
      সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে
                       কপোল-তলে!
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর ‘পর–
      হাঁকে ঐ ‘জয় প্রলয়ঙ্কর!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

মাভৈ মাভৈ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে!
জরায়-মরা মুমূর্ষদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে!
      এবার মহা-নিশার শেষে
      আস্‌বে ঊষা অরুণ হেসে
                        করুণ বেশে!
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর,
      আলো তার ভর্‌বে এবার ঘর।
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

 

ঐ সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িত-চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড়-তুফানে!
খুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!
                    গগন-তলের নীল খিলানে।
      অন্ধ করার বন্ধ কূপে
      দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে
                          পাষাণ স্তূপে!
এই তো রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর–
      শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর।
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
 

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? –প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন– জীবন-হারা অ-সুন্দরে কর্‌তে ছেদন!
      তাই সে এমন কেশে বেশে
      প্রলয় বয়েও আস্‌ছে হেসে–
                           মধুর হেসে!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
 

ঐ ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!–
      বধূরা প্রদীপ তুলে ধর্‌!
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!–
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

রক্তাম্বরধারিণী মা

রক্তাম্বর পর মা এবার
জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন।
দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন
বাজে তরবারি ঝনন-ঝন।
সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেল মা গো
জ্বাল সেথা জ্বাল কাল্-চিতা।
তোমার খড়গ-রক্ত হউক
স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা।
এলোকেশে তব দুলুক ঝন্‌ঝা
কাল-বৈশাখী ভীম তুফান,
চরণ-আঘাতে উদ্গারে যেন
আহত বিশ্ব রক্ত-বান।
নিশ্বাসে তব পেঁজা-তুলো সম
উড়ে যাক মা গো এই ভুবন,
অ-সুরে নাশিতে হউক বিষ্ণু
চক্র মা তোর হেম-কাঁকন।
টুটি টপে মারো অত্যাচারে মা,
গল-হার হোক নীল ফাঁসি,
নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা
উঠুক সরোষে উদ্ভাসি।
হাসো খলখল, দাও করতালি,
বলো হর হর শঙ্কর!
আজ হতে মা গো অসহায় সম
ক্ষীণ ক্রন্দন সম্বর।
মেখলা ছিঁড়িয়া চাবুক করো মা,
সে চাবুক করো নভ-তড়িৎ,
জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে
লালে-লাল হোক শ্বেত হরিৎ।
নিদ্রিত শিবে লাথি মারো আজ,
ভাঙো মা ভোলার ভাঙ-নেশা,
পিয়াও এবার অ-শিব গরল
নীলের সঙ্গে লাল মেশা।
দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
অশিব-নাশিনী চণ্ডি রূপ;
দেখাও মা ঐ কল্যাণ-করই
আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তূপ।
শ্বেত শতদল-বাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বরধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।

আগমনী

একি     রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন–
ঝন      রনরন রন ঝনঝন!
সেকি    দমকি দমকি
                ধমকি ধমকি
           দামা-দ্রিমি-দ্রিমি গমকি গমকি
               ওঠে চোটে চোটে,
          ছোটে লোটে ফোটে
          বহ্নি-ফিনিকি     চমকি   চমকি
                    ঢাল-তলোয়ারে খনখন!
          একি    রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন
                    রণ    ঝনঝন ঝন রণরণ!

 

হৈ       হৈ রব
ঐ       ভৈরব
হাঁকে,   লাখে লাখে
ঝাঁকে   ঝাঁকে ঝাঁকে
লাল     গৈরিক-গায় সৈনিক ধায় তালে তালে
ওই      পালে পালে,
              ধরা কাঁপে দাপে।
          জাঁকে    মহাকাল কাঁপে থরথর!
          রণে     কড়কড় কাড়া-খাঁড়া-ঘাত,
শির    পিষে হাঁকে রথ-ঘর্ঘর-ধ্বনি ঘররর!
‘গুরু   গরগর’ বোলে ভেরী তূরী,
‘হর    হর হর’
করি   চীৎকার ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!
ওঠে   ঝন্‌ঝা ঝাপটি দাপটি সাপটি
             হু-হু-হু-হু-হু-হু-শনশন!
ছোটে  সুরাসুর-সেনা হনহন!

 

তাতা   থৈথৈ তাতা থৈথৈ খল খল খল
নাচে   রণ-রঙ্গিণী সঙ্গিনী সাথে,
         ধকধক জ্বলে জ্বলজ্বল
বুকে   মুখে চোখে রোষ-হুতাশন!
        রোস্ কোথা শোন্!

 

ঐ     ডম্বরু-ঢোলে ডিমিডিমি বোলে,
       ব্যোম মরুৎ স-অম্বর দোলে,
       মম-বরুণ কী কল-কল্লোলে চলে উতরোলে
       ধ্বংসে মাতিয়া     তাথিয়া তাথিয়া
                    নাচিয়া রঙ্গে! চরণ-ভঙ্গে
                    সৃষ্টি সে টলে টলমল!

 

ওকি   বিজয়-ধ্বনি সিন্ধু গরজে কলকল কল কলকল!
            ওঠে    কোলাহল,
            কূট      হলাহল
            ছোটে   মন্থনে পুন রক্ত-উদধি,
                      ফেনা-বিষ ক্ষরে গলগল!
টলে   নির্বিকার সে বিধাত্রীরো গো
               সিংহ-আসন টলমল!
কার   আকাশ-জোড়া ও আনত-নয়ানে
              করুণা-অশ্রু ছলছল!

 

বাজে   মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁজর ঝম্‌ঝম,
নাচে   ধূর্জটি সাথে প্রমথ ববম্ বম্‌বম্!
লাল    লালে-লাল ওড়ে ঈশানে নিশান যুদ্ধের,
ওঠে   ওঙ্কার রণ-ডঙ্কার,
নাদে   ওম্ ওম্ মহাশঙ্খ বিষাণ রুদ্রের!
         ছোটে   রক্ত-ফোয়ারা বহ্নির বান রে!
         কোটি   বীর-প্রাণ
         ক্ষণে    নির্বাণ
তবু    শত সূর্যের জ্বালাময় রোষ
              গমকে শিরায় গম্‌গম্!
ভয়ে   রক্ত-পাগল প্রেত পিশাচেরও
              শিরদাঁড়া করে চন্‌চন্!
যত    ডাকিনী যোগিনী বিস্ময়াহতা,
              নিশীথিনী ভয়ে থম্‌থম্!
বাজে  মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝম্‌ঝম্!

 

ঐ     অসুর-পশুর মিথ্যা দৈত্য-সেনা যত
হত    আহত করে রে দেবতা সত্য!
        স্বর্গ, মর্ত, পাতাল, মাতাল রক্ত-সুরায়;
                 ত্রস্ত বিধাতা,
মস্ত পাগল পিনাক-পাণি স-ত্রিশূল প্রলয়-হস্ত ঘুরায়!
                              ক্ষিপ্ত সবাই রক্ত-সুরায়!

 

              চিতার উপরে চিতা সারি সারি,
                      চারিপাশে তারি
              ডাকে কুক্কুর গৃহিনী শৃগাল!
              প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!
              প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!!
আজ   রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ্ মহারণ,
         দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে দশ প্রহরণ!
                    পদতলে লুটে মহিষাসুর,
         মহামাতা ঐ সিংস-বাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে–
         শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!
                          ‌‌’নাই দানব
                           নাই অসুর,–
                           চাইনে সুর,
                           চাই মানব!’–
               বরাভয়-বাণী ঐ রে কার
               শুনি, নহে হৈ রৈ এবার!

 

                              ওঠ্ রে ওঠ্,
                              ছোট্ রে ছোট্!
                              শান্ত মন,
                              ক্ষান্ত রণ!–

 

                             খোল্ তোরণ,
                             চল্ বরণ
                             করব্ মা’য়;
                             ডর্‌ব কায়?
            ধরব পা’য় কার্ সে আর,
            বিশ্ব-মা’ই পার্শ্বে যার?
আজ   আকাশ-ডোবানো নেহারি তাঁহারি চাওয়া,
ঐ     শেফালিকা-তলে কে বালিকা চলে?
        কেশের গন্ধ আনিছে আশিন-হাওয়া!
        এসেছে রে সাথে উৎপলাক্ষী চপলা কুমারী কমলা ঐ,
                সরসিজ-নিভ শুভ্র বালিকা
      এল            বীণা-পাণি অমলা ঐ!

 

                    এসেছে গনেশ,
                    এসেছে মহেশ,
                    বাস্‌রে বাস্!
                    জোর উছাস্!!
      এল সুন্দর সুর-সেনাপতি,
      সব মুখ এ যে চেনা-চেনা অতি!
      বাস্ রে বাস্‌   জোর উছাস্!!

 

      হিমালয়! জাগো! ওঠো আজি,
                  তব সীমা লয় হোক।
      ভুলে যাও শোক– চোখে জল ব’ক
      শান্তির– আজি শান্তি-নিলয় এ আলয় হোক!
            ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক!
            মা’র আবাহন-গীত্ চলুক!
                দীপ জ্বলুক!
                গীত চলুক!!
আজ   কাঁপুক মানব-কলকল্লোলে কিশলয় সম নিখিল ব্যোম্!
                    স্বা-গতম্!
                    স্বা-গতম্!!
                    মা-তরম্!
                    মা-তরম্!!
      ঐ   ঐ  ঐ  বিশ্ব কণ্ঠে
      বন্দনা- বাণী লুণ্ঠে-‘বন্দে মাতরম্!!!

ধূমকেতু

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত— সাতশো নরক-জ্বালা জলে মম ললাটে,
মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে।
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার—
আর মর্তে সাহারা-গোবি-ছাপ,
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ!

আমি সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁও বোঁও ঘুরি শূন্যে,
আমি বিষ-ধূম-বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান-অভিমুন্যে।
শোঁও শন-নন-নন-শন-নন-নন শাঁই শাঁই,
ঘুর্ পাক্ খাই, ধাই পাঁই পাঁই
মম পুচ্ছে জড়ায়ে সৃষ্টি;
করি উল্কা-অশনি-বৃষ্টি,—
আমি একটা বিশ্ব গ্রাসিয়াছি, পারি গ্রাসিতে এখনো ত্রিশটি।
আমি অপঘাত দুর্দৈব রে আমি সৃষ্টির অনাসৃষ্টি!

আমি আপনার বিষ-জ্বালা-মদ-পিয়া মোচড় খাইয়া খাইয়া
জোর বুঁদ হয়ে আমি চলেছি ধাইয়া ভাইয়া!
শুনি মম বিষাক্ত ‘রিরিরিরি’-নাদ
শোনায় দ্বিরেফ-গুঞ্জন সম বিশ্ব-ঘোরার প্রণব-নিনাদ!
ধূর্জটি-শিখ করাল পুচ্ছে
দশ অবতারে বেঁধে ঝ্যাঁটা করে ঘুরাই উচ্চে, ঘুরাই—
আমি অগ্নি-কেতন উড়াই!—

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ বামন বিধি সে আমারে ধরিতে বাড়ায়েছিল রে হাত
মম অগ্নি-দাহনে জ্বলে পুড়ে তাই ঠুঁটো সে জগন্নাথ!
আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।
আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তাও!
তাই বিপ্লব আনি বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফে তাও!
তোর নিযুত নরকে ফুঁ দিয়ে নিবাই, মৃত্যুর মুখে থুথু দি!
আর যে যত রাগে রে তারে তত কাল্-আগুনের কাতুকুতু দি।
মম তূরীয় লোকের তির্যক, গতি তূর্য গাজন বাজায়
মম বিষ নিশ্বাসে মারীভয় হানে অরাজক যত রাজায়!

কচি শিশু-রসনায় ধানি-লঙ্কার পোড়া ঝাল
আর বদ্ধ কারায় গন্ধক ধোঁয়া, এসিড, পটাশ, মোন্ছাল,
আর কাঁচা কলিজায় পচা ঘা’র সম সৃষ্টিরে আমি দাহ করি
আর স্রষ্টারে আমি চুষে খাই।
পেলে বাহান্ন-শও জাহান্নমেও আধা চুমুকে সে শুষে যাই!

আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু—
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
আমি শি শি শি প্রলয়-শিশ্ দিয়ে ঘুরি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি,
আমি ত্রিভুবন তার পোড়ায়ে মারিয়া আমিই করিব মুখাগ্নি!
তাই আমি ঘোর তিক্ত সুখে রে, একপাক ঘুরে বোঁও করে ফের দু’পাক নি!
কৃতঘ্নী আমি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি!

পঞ্জর মম খর্পরে জ্বলে নিদারুণ যেই বৈশ্বানর—
শোন্ রে মর, শোন্ অমর!—
সে যে তোদের ঐ বিশ্বপিতার চিতা!
এ চিতাগ্নিতে জগদীশ্বর পুড়ে ছাই হবে, হে সৃষ্টি জানো কি তা?
কি বলো? কি বলো? ফের বলো ভাই আমি শয়তান-মিতা!
হো হো ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালায়েছি বুকে চিতা!
ছোট শন শন শন ঘর ঘর ঘর সাঁই সাঁই!
ছোট পাঁই পাঁই!
তুই অভিশাপ তুই শয়তান তোর অনন্তকাল পরমাই।
ওরে ভয় নাই তোর মার নাই!!
তুই প্রলয়ঙ্কর ধূমকেতু,
তুই উগ্র ক্ষিপ্ত তেজ-মরীচিকা ন’স্ অমরার ঘুম-সেতু
তুই ভৈরব ভয় ধূমকেতু!
আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ ঈশ্বর-শির উল্লঙ্ঘিতে আমি আগুনের সিঁড়ি,
আমি বসিব বলিয়া পেতেছে ভবানী ব্রহ্মার বুকে পিঁড়ি!
খ্যাপা মহেশের বিক্ষিপ্ত পিনাক, দেবরাজ-দম্ভোলি
লোকে বলে মোরে, শুনে হাসি আমি আর নাচি বব-বম্ বলি!
এই শিখায় আমার নিযুত ত্রিশূল বাশুলি বজ্র-ছড়ি
ওরে ছড়ানো রয়েছে, কত যায় গড়াগড়ি!
মহা সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্ব-সম্রাট নিরবধি,
তার ললাটে তপ্ত অভিশাপ-ছাপ এঁকে দিই আমি যদি!
তাই টিটকিরি দিয়ে হাহা হেসে উঠি,
সে হাসি গুমরি লুটায়ে পড়ে রে তুফান ঝন্ঝা সাইক্লোনে টুটি!

আমি বাজাই আকাশে তালি দিয়া ‘তাতা-উর্-তাক্’
আর সোঁও সোঁও করে প্যাঁচ দিয়ে খাই চিলে-ঘুড়ি সম ঘুরপাক!
মম নিশাস আভাসে অগ্নি-গিরির বুক ফেটে ওঠে ঘুত্কার
আর পুচ্ছে আমার কোটি নাগ-শিশু উদ্গারে বিষ-ফুত্কার!

কাল বাঘিনী যেমন ধরিয়া শিকার
তখনি রক্ত শোষে না রে তার,
দৃষ্টি-সীমায় রাখিয়া তাহারে উগ্রচণ্ড-সুখে
পুচ্ছ সাপটি খেলা করে আর শিকার মরে সে ধুঁকে!
তেমনি করিয়া ভগবানে আমি
দৃষ্টি-সীমায় রাখি দিবাযামী
ঘিরিয়া ঘিরিয়া খেলিতেছি খেলা, হাসি পিশাচের হাসি
এই অগ্নি-বাঘিনী আমি যে সর্বনাশী!

আজ রক্ত-মাতাল উল্লাসে মাতি রে—
মম পুচ্ছে ঠিকরে দশগুণ ভাতি,
রক্ত রুদ্র উল্লাসে মাতি রে!
ভগবান? সে তো হাতের শিকার!— মুখে ফেনা উঠে মরে!
ভয়ে কাঁপিছে, কখন পড়ি গিয়া তার আহত বুকের পরে!
অথবা যেন রে অসহায় এক শিশুরে ঘিরিয়া
অজগর কাল-কেউটে সে কোনো ফিরিয়া ফিরিয়া
চায়, আর ঘোরে শন্ শন্ শন্,
ভয়-বিহ্বল শিশু তার মাঝে কাঁপে রে যেমন—
তেমনি করিয়া ভগবানে ঘিরে
ধূমকেতু-কালনাগ অভিশাপ ছুটে চলেছি রে;
আর সাপে-ঘেরা অসহায় শিশু সম
বিধাতা তাদের কাঁপিছে রুদ্র ঘূর্ণির মাঝে মম!

আজিও ব্যথিত সৃষ্টির বুকে ভগবান কাঁদে ত্রাসে,
স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি পাছে বা বড় হয়ে তারে গ্রাসে!