চাঁপার কলির তুলিকায়, কাজল লেখায় শ্রীমতী শ্রীহরির ছবি আঁকে।
রাই ছবি আঁকে পটে গো, যারে হেরে নিতি গোঠে যেতে
যমুনার তটে গো, সে বংশী বাজায়ে মঞ্জির পায়ে
নাচে ছায়া বটে গো, রাই ছবি আঁকে পটে গো।
আঁকিয়া শ্যামের মূরতি আঁকিল না রাধা শ্রীচরণ ,
রাধা চরণ আঁকে না, তুলি তুলিয়া রাখে চরণ আঁকে না।
তখন ললিতা বলে- ‘রাধা! রাধা! রাধা!
তুই আঁকলি না কেন চরণ রাধা!’
‘জীবন মরণ যে চরণে বাঁধা, আঁকলি না কেন চরণ রাধা-
বিশ্বের ত্রাণ বৃন্দাবনের ধ্যানজ্ঞান ব্রজগোপী সাধা’-
‘আঁকলি না কেন চরণ রাধা’-!
তখন রাধা কেঁদে বলে- ‘ওগো ললিতা-
সখি আঁকিলে চরণ যাবে সে পালায়ে আমি হব পদদলিতা।
পলায়ে যাবে গো মথুরায়, আবার পালায়ে যাবে গো-
চির চপল সে মথুরায় আবার পালায়ে যাবে গো-
থাক লুকানো হৃদয়ে শ্রীচরণ।’
kazinazrulislam
চাঁদের মতো নীরবে এসো প্রিয় নিশীথ রাতে
চাঁদের মতো নীরবে এসো প্রিয় নিশীথ রাতে।
ঘুম হয়ে পরশ দিও হে প্রিয়, নয়ন–পাতে।।
তব তরে বাহির–দুয়ার মম
খুলিবে না এ–জনমে প্রিয়তম,
মনের দুয়ার খুলি’ গোপনে এস বিজড়িত রহিও স্মৃতির সাথে।।
কুসুম–সুরভি হ’য়ে এসো নিশি–পবনে,
রাতের পাপিয়া হয়ে পিয়া পিয়া ডাকিও বন–ভবনে।
আঁখি–জল হয়ে আঁখিতে আসিও
বেণুকার সুর হয়ে শ্রবণে ভাসিও,
বিরহ হ’য়ে এসো হে চির–বিরহী আমার অন্তর–বেদনাতে।।
চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা, চাঁদের চেয়েও জ্যোতি
চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা, চাঁদের চেয়েও জ্যোতি।
তুমি দেখাইলে মহিমান্বিতা নারী কী শক্তিমতী।।
শিখালে কাঁকন চুড়ি পরিয়াও নারী,
ধরিতে পারে যে উদ্ধত তরবারি,
না রহিত অবরোধের দুর্গ, হতো না এ দুর্গতি।।
তুমি দেখালে নারীর শক্তি স্বরূপ – চিন্ময়ী কল্যাণী,
ভারত জয়ীর দর্প নাশিয়া মুছালে নারীর গ্লানি।
তুমি গোলকুন্ডার কোহিনূর হীরা সম
আজো ইতিহাসে জ্বলিতেছে নিরুপম,
রণরঙ্গিণী ফিরে এসো,
তুমি ফিরিয়া আসিলে, ফিরিয়া আসিবে লক্ষী ও সরস্বতী।।
চাঁদিনী রাতে কানন-সভাতে আপন হাতে গাঁথিলে মালা
চাঁদিনী রাতে কানন-সভাতে আপন হাতে গাঁথিলে মালা।
সয়েছি বুকে নিবিড় সুখে তোমারি হাতের সূচিব জ্বালা।।
আজিও জাগে লোহিত রাগে রঙিন গোলাবে তাহারি ব্যথা
তব ও গলে দুলিব ব’লে দিয়েছি কুলে কলঙ্ক-কালা ।।
যদি ও গলে নেবে না তুলে কেন বধিলে ফুলের পরান
অভিমানে হায় মালা যে শুকায় ঝ’রে ঝ’রে যায় লাজে নিরালা।।
চাঁদ হেরিছে চাঁদ–মুখ তার সরসীর আরশিতে
চাঁদ হেরিছে চাঁদ–মুখ তার সরসীর আরশিতে।
ছুটে তরঙ্গ বাসনা–ভঙ্গ সে অঙ্গ পরশিতে।।
হেরিছে রজনী – রজনী জাগিয়া
চকোর উতলা চাঁদের লাগিয়া,
কাঁহা পিউ কাঁহা ডাকিছে পাপিয়া
কুমুদীরে কাঁদাইতে।।
না জানি সজনী কত সে রজনী কেঁদেছে চকোরী পাপিয়া,
হেরেছে শশীরে সরসী–মুকুরে ভীরু ছায়া–তরু কাঁপিয়া।
কেঁদেছে আকাশে চাঁদের ঘরণী
চির–বিরহিণী রোহিণী ভরণী
অবশ আকাশ বিবশা ধরণী
কাঁদানীয়া চাঁদিনীতে।।
চোখের নেশার ভালোবাসা সে কি কভু থাকে গো
চোখের নেশার ভালোবাসা সে কি কভু থাকে গো
জাগিয়া স্বপনের স্মৃতি স্মরণে কে রাখে গো।।
তোমরা ভোল গো যা’রে চিরতরে ভোল তা’রে
মেঘ গেলে আবছায়া থাকে কি আকাশে গো।।
পুতুল লইয়া খেলা খেলেছ বালিকা বেলা
খেলিছ পরাণ ল’য়ে তেমনি পুতুল খেলা।
ভাঙ্গিছ গড়িছ নিতি হৃদয়–দেবতাকে গো।
চোখের ভালোবাসা গ’লে
শেষ হ’য়ে যায় চোখের জলে
বুকের ছলনা সেকি নয়ন জলে ঢাকে গো।।
চল্ চল্ চল্। চল্ চল্ চল্।
চল্ চল্ চল্। চল্ চল্ চল্।
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণী–তল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল্ রে চল্ রে চল্
চল্ চল্ চল্।।
ঊষার দুয়ারে হানি’ আঘাত
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত
আমরা টুটাব তিমির রাত
বাধার বিন্ধ্যাচল।
নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান
আমরা দানিব নতুন প্রাণ
বাহুতে নবীন বল।
চল্ রে নও জোয়ান
শোন্ রে পাতিয়া কান
মৃত্যু–তোরণ–দুয়ারে–দুয়ারে
জীবনের আহ্বান।
ভাঙ্ রে ভাঙ্ আগল
চল্ রে চল্ রে চল্
চল্ চল্ চল্।।
চল্ রে চপল তরুণ-দল বাঁধন হারা
চল্ রে চপল তরুণ-দল বাঁধন হারা
চল্ অমর সমরে, চল ভাঙি’ কারা
জাগায়ে কাননে নব পথের ইশারা।।
প্রাণ-স্রোতের ত্রিধারা বহায়ে তোরা ওরে চল!
জোয়ার আনি, মরা নদীতে পাহাড় টলায়ে মাতোয়ারা।।
ডাকে তোরে স্নেহভরে ‘ওরে ফিরে আয় ফিরে ঘরে’
তারে ভোল্ ওরে ভোল্ তোরা যে ঘর-ছাড়া।।
তাজা প্রাণের মঞ্জুরি ফুটায়ে পথে তোরা চল্,
রহে কে ভুলে ছেঁড়া পুঁথিতে তাদের পরানে দে রে সাড়া।
রণ-মাদল আকাশে ঘন বাজে গুরু গুরু।
আঁধার ঘরে কে আছে প’ড়ে তাহার দুয়ারে দে রে নাড়া।।
চম্’কে চম্’কে ধীর ভীরু পায়
চম্’কে চম্’কে ধীর ভীরু পায়,
পল্লী–বালিকা বন–পথে যায় একেলা বন–পথে যায়।।
শাড়ি তার কাঁটা লতায়, জড়িয়ে জড়িয়ে যায়,
পাগল হাওয়াতে অঞ্চল ল’য়ে মাতে –
যেন তার তনুর পরশ চায়।।
শিরীষের পাতায় নূপুর, বাজে তার ঝুমুর ঝুমুর,
কুসুম ঝরিয়া মরিতে চাহে তার কবরীতে,
পাখী গায় পাতার ঝরোকায়।।
চাহি’ তা’র নীল নয়নে, হরিণী লুকায় বনে,
হাতে তা’র কাঁকন হ’তে মাধবী লতা কাঁদে,
ভ্রমরা কুন্তলে লুকায়।।
চম্পা পারুল যূথী টগর চামেলা
চম্পা পারুল যূথী টগর চামেলা।
আর সই, সইতে নারি ফু-ঝামেলা।।
সাজায়ে বন-ডালি,
বসে রই বন-মালি
যা’রে দিই এ ফুল সেই হানে হেলাফেলা।।
কে তুমি মায়া-মৃগ
রতির সতিনী গো
ফুল নিতে আসিলে এ বনে অবেলা।।
ফুলের সাথে প্রিয়
ফুল মালরে নিও
তুমিও এক সই, আমিও একেলা।।