স্মরণে নজরুল – মাসুদুর রহমান (শাওন), পঞ্চাশ, গোপালপুর, টাঙ্গাইল।

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একজন নজরুল সেনার  লেখা
স্মরণে নজরুল
– মাসুদুর রহমান (শাওন), পঞ্চাশ, গোপালপুর, টাঙ্গাইল।

তুমি এসেছিলে হে মহান প্রেমের পুরুষ নীরবে,
ছড়াতে প্রেম প্রতিটি কণাতে এসেছিলে ভবে।
জাগায়েছ তুমি প্রাণ করেছ তাতে ত্রাণ,
নিথর নিরসে দিয়াছ ভরে করেছ প্রেমে অম্লান।।

বেঁধেছ তুমি প্রেমেরও সুর দিবানিশি সারাক্ষণে,
তাই স্মরিগো তোমায় নত হয়ে তব কাব্য চরণে।
দিয়াছ মহা-কালের সন্ধান দেখায়েছে মহা-প্রাণ,
শিখায়েছ প্রেম গ্রোথিত করে হৃদয় কণ্ঠে গান।।

তুমি রয়ে যাবে রয়ে যাবে শত স্রোতেরও কালে,
হৃদয়ে হৃদয়ে জেগে রবে তব সৃষ্টির মায়াজালে।
যে চায় খুঁজিতে শুদ্ধে বুঝিতে প্রেমের পরিচয়,
সে যেন তবে তোমারেই খোঁজে
তোমাতেই মজে রয়।।

আবার শেখাও প্রেম
– মাসুদুর রহমান (শাওন), পঞ্চাশ, গোপালপুর, টাঙ্গাইল।

নজরুল তুমি কই? বাজাও বিষের বাঁশি,
সত্য ন্যায়ের পাল তুলে দাও অসত্যেরে ফাঁসি।
দারিদ্রে পিষ্টে যে জন মরে দাও তারে সুখ আনি,
নিষ্পাপ জনের লৌহ কবাটে দিয়ে যাও আঘাত হানি।।

মুছে দাও তুমি বিভেদ মানুষে সকলে করো একজাতি,
ঘৃণার দেয়াল ধুলায় লুটায়ে দিয়ে যাও প্রেমের খ্যাতি।
অত্যাচারে ঘাতে ঘাতে আজ মরিছে অবুঝ শিশু,
সকলের হিয়ায় বাঁধিতে দরদ এসো হয়ে আজ যিশু।।

নীতির মঙ্গায় ঘৃণিত হচ্ছে দেশ ললাটের নেতা,
সম্যের গান আবার শুনায়ে প্রীতি দিয়ে যাও যথা।
দূরে তুমি থেকোনা আজি এই বঙ্গ হারায় প্রাণ,
তাবেদারী রোধে বিদ্রোহ করে সার্বভৌম করো দান।।

নূরজাহান

নূরজাহান! নূরজাহান!  
সিন্ধু নদীতে ভেসে    (এলে) মেঘলা-মতির দেশে 
                  ইরানি গুলিস্থান॥  
নার্গিস লালা গোলাপ আঙুর-লতা  
শিঁরি-ফরহাদ-শিরাজের উপকথা  
এসেছিলে তুমি তনুর পেয়ালা ভরি  
                  বুলবুলি, দিলরুবা, রবাবের গান॥  
তব প্রেমে উন্মাদ ভুলিল সেলিম সে যে রাজধিরাজ–  
চন্দন সম মাখিল অঙ্গে কলঙ্ক লোক-লাজ।  
যে কলঙ্ক লয়ে হাসে চাঁদ নীলাকাশে
(যাহা) লেখা থাকে শুধু প্রেমিকের ইতিহাসে  
দেবে চিরদিন নন্দন-লোকচারী
তব সেই কলঙ্ক সে প্রেমের সম্মান॥

Categories

নজরুল সাহিত্যঃ ধর্মীয় উদারতায় সামাজিক সংহতির বীজ উপ্ত – সৈয়দ ইকবালঃ অধ্যাপক, কবি ও লেখক।

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একজন নজরুল সেনার  লেখা
নজরুল সাহিত্যঃ ধর্মীয় উদারতায় সামাজিক সংহতির বীজ উপ্ত
– সৈয়দ ইকবালঃ অধ্যাপক, কবি ও লেখক।
বাংলা সাহিত্যাকাশের ধ্রুবতারা কবি কাজী নজরুল ইসলাম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, অনুবাদক,
সঙ্গীতজ্ঞ, সুরস্রষ্টা, চিত্র পরিচালক, চিত্র-নির্মাতা, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ,
সৈনিক, দার্শনিক ইত্যাদি বহুধা গুণের অধিকারী হওয়া সত্বেও পাঠকহৃদয়ে যে স্থান তাঁর
অবধারিত তা হচ্ছে ‘কবি’। বাংলাদেশের জাতীয় কবি, ভারতবর্ষের বিদ্রোহী কবি। নজরুলের
প্রতিটি লেখায়ই মনে হয় তিনি শব্দ ও ভাষার খেলায় মত্ত। আরবী, ফার্সি, বাংলা, সংস্কৃত,
হিন্দি, উর্দু সব ভাষার সম্মীলন ঘটিয়ে জন্ম দিয়েছেন এক নূতন ভাষার। তাঁর এই অনন্য
সৃজনশৈলী বাংলা ভাষায় সৃষ্টি করেছে নূতন মাত্রিকতা। তবে আমাদের দৃষ্টি সেদিকে না দিয়ে আজ
বিস্তার করবো ভিন্নদিকে।

আমরা জানি, ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা নজরুল একদিকে যেমন বিদ্রোহের কবি, অন্যদিকে প্রেমের
কবিও বটে। তবে তিনি ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে যেসব প্রবন্ধ, কবিতা, গান ইত্যাদি রচনা করেছেন
তার সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। বিশ্বাসীর মনোজগতে ধর্ম কীভাবে কাজ করে এবং সে বিশ্বাস
থেকে মানবকল্যাণের পথ কতটা সুদৃঢ় হয় তা নজরুল সাহিত্য চর্চা থেকে অনুমেয়। সাম্প্রতিক
বিশ্বে ধর্মচর্চা কিংবা ধর্মের স্বপক্ষে কথা বললে তা প্রায়শঃ একক সম্প্রদায়ের বক্তব্যেই
পর্যবসিত হতে দেখা যায়, যা অন্য সম্প্রদায়ে তেমন আবেদন জানায় না। অথচ নজরুল ধর্ম নিয়ে
এত গভীরভাবে সাহিত্যসৃজন করেছেন যা অপরাপর সম্প্রদায়ে সমভাবে আবেদন জানিয়েছে। আমি
এখানে অসম্প্রদায়িকতা ব্যবহার করছি না, কেননা প্রত্যেকটি মানুষেরই স্ব স্ব সম্প্রদায়ের
প্রতি সহানুভূতি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আপন সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে উদার-
নৈতিক মনোবৃত্তির আলোকে ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রম পরিচালিত হলেই কেবল তা
সমাজবাসীর কল্যাণে আসে; অন্যথায় সে তার সংকীর্ণতার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে এবং
সমাজবাসীর কাছে গৃহিত হওয়ার যোগ্যতা হারায়। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত সে উদার-নৈতিকদৃষ্টি
অবলম্বন করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার চিন্তা-চেতনা সকল সম্প্রদায়ে কিংবা সকল শ্রেণীতে
সমাদৃত হয়; যেটি হয়েছিলো নজরুলের ক্ষেত্রে।

নজরুলের লেখা দিয়ে শুরু করি তাহলে আমাদের আলোচনা। তিনি বলেন,
“আল্লাহ পরম প্রিয়তম মোর, আল্লাহ তো দূরে নয়,
নিত্য আমারে জড়াইয়া আছে সেই সে প্রেমময়”।
কিংবা,
“আল্লাহ আমার মাথার মুকুট, রাসুল গলার হার, না
মাজ, রোজা ওড়না শাড়ী তাতেই আমায় মানায় ভারী,
কলমা আমার কপালে টিপ নাই তুলনা যার”।

তাঁর এসব রচনা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে এক নিগূঢ় সম্পর্কই স্থাপন করে, বিভাজন নয়।
কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনার মর্মস্পর্শী বর্ণনায় তিনি যখন বলেন,
“নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া,
আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া”
কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফুরাতে,
সে কাঁদনে আসু আনে সীমারের ছুরাতে”।

অথবা যখন একজন মুসলিম নেতার দায়িত্বজ্ঞানের ব্যাখ্যাদানকালে ‘হযরত উমরের কণ্ঠে বলেন,
“রোয কিয়ামতে আল্লাহ্‌ যেদিন কহিবে, – উমর! ওরে,
করেনি খলীফা মুসলিম জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে”।
কিংবা যখন মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর তিরোধানের বর্ণনায় বলেন,
“একি বিস্ময়! আজরাইলেরও জলে ভর-ভর চোখ।
বে-দরদ দিল কাপে থর-থর যেন জ্বর-জ্বর শোক।
জান মারা তাঁর পাষাণ পাঞ্জাহ্‌ বিলকুল ঢিলা আজ
কব্জা নিসাড়, কলিজা সুরাখ, খাক চুমে নীলা তাজ”।
এমন অনেক লেখার মাধ্যমে নজরুল মুসলিম মানসে ধর্মীয় চেতনা উজ্জীবিত করেছেন। মুসলিম-
মনে ভাবাবেগ ও অনুভূতির অনুররণ সৃষ্টির মাধ্যমে এক আধ্যাত্মভাবের পাশাপাশি বাস্তবজীবনে
এর প্রয়োগ প্রক্রিয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আপন ধর্মের বিভিন্ন অনুষঙ্গ বা প্রার্থনাগীতির পাশাপাশি অপর ধর্মের ভক্তিগীতি বা
প্রার্থনাগীতি কিংবা ধর্মের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে সাহিত্য রচনা করেও আস্তিক বা ভাবুকমনে
ভাবের সঞ্চার করে তিনি তাঁর পাঠককে খোদাপ্রাপ্তির নেশায় বুঁদ করে দেন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার গান বা ভক্তিগানের মধ্যে অজস্র শ্যামাসংগীত ছিলো তাঁর অনন্য
সৃষ্টি। ভক্তের মনের অনুভূতিকে আপনমনে ধারণ করে রচিত তাঁর কবিতা ও গান আজো গীতো হয়ে
আসছে। বহু জনপ্রিয় রাধাকৃষ্ণের গান বেঁধেছেন তিনি এভাবে –
গোঠের রাখাল বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন,
যেথা রাখাল রাজা গোপাল আমার খেলে অনুক্ষণ।”
বা,
“গগনে কৃষ্ণমেঘ দোলে, কিশোর কৃষ্ণ দোলে বৃন্দাবনে”।
তাছাড়া কালিকীর্তনে তিনি বলেন,
“বল রে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল”
আবার একই সঙ্গে লিখেছেন,
“আর কতকাল থাকবি দেবী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।”
অপর শ্যামা সংগীতে বলেন,
আমি সাধ ক'রে মোর গৌরী মেয়ের নাম রেখেছি কালি,
আয় বিজয়া আয়রে জয়া আয় মা চঞ্চলা মুক্তকেশী শ্যামা কালি”।
তিনি একজন চিত্রনায়কের মত ধর্মীয় মানসে প্রবেশ করে কখনো চিত্রায়িত করছেন মুসলিম
অনুভূতি, কখনো হিন্দু কখনো ক্রীশ্চান অনুভূতিকে কিন্তু কখনো নিজেকে ও নিজের সম্প্রদায়গত
সত্তাকে ভুলে যান নি। তবে তিনি মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন বলে কেবল মুসলিমদের জন্য
সাহিত্যসৃজন করেই ক্ষান্ত হবেন এমনটি হয়নি বরং সকল ধর্মের, সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি
হয়ে সাহিত্যসৃষ্টি করে তিনি বিশ্বাসী-মনে বিশ্বাসের প্রগাঢ়তাই সমৃদ্ধ করেছেন। এভাবে তিনি
আস্তিকের মনোজগতে আপন আসন গেঁড়ে বসতে সক্ষম হয়েছেন।
অধিকারের চেতনায় জাতিকে তিনি যেমন জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তেমনি ধর্মীয় চেতনায় জাগ্রত
করে সমাজবাসীর মন-মস্তিষ্ককে উর্বর করার মাধ্যমে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে
চেয়েছেন। ধর্মীয়বোধ প্রবল হলে ব্যক্তিমানুষ নৈতিক হয়ে উঠবে এবং সমাজেও শান্তি-শৃঙ্খলা
বিরাজ করবে। আর তা থেকে সকল সম্প্রদায়ই নিজেদের ধারণার অনুকূলে সাহিত্যরস লাভ করবে
এবং তা নিজেদের ধারণা ও বিশ্বাসের জগতে থেকেই। অর্থাৎ সম্প্রদায় আপন আপনই থাকবে
কিন্তু এরই প্রেক্ষিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্প্রদায়িকতা গড়ে উঠবে। আর সম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য
এই অর্থেই সঠিক; সব ভেঙ্গে নূতন কিছু গড়ার ধারণা আকবরের দীনে এলাহীর মত হয়ে পড়বে।
অনেক কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক যেখানে আপন ধর্মের প্রভাব-বলয় থেকে বেরিয়ে
এসে সাহিত্যরচনা করতে পারেন নি, সেখানে নজরুল এ কাজটি করতে পেরেছিলেন অবলীলায়। বিংশ
শতাব্দীর ঔপনিবেশিক আমলে বিভাজিত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়নের পরিবেশে
তিনি যখন ক্বোরআন- হাদিস কিংবা নবী-সাহাবাদের কথা বলেন, তখন তিনি অমুসলিম দ্বারা
সমালোচিত হন; আবার যখন অমুসলিমদের দেব-দেবী, পূজা-অর্চনা নিয়ে কবিতা-সঙ্গীত রচনা
করে্‌ তখন মুসলিমদের দ্বারা সমালোচিত হন। তারপরও তিনি এ পথ পরিহার করেননি বরং তিনি
কোরান-পুরাণ, মিঞা–বাবু, বদনা-গাড়ু ইত্যাদিতে সমন্বয় ও সম্প্রীতির বন্ধন সৃজনে নিজেকে
ব্যাপৃত রেখেছিলেন নিয়ত। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য হেন চেষ্টা নেই যে তিনি করেননি। তিনি
তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে গালাগালিকে গলাগলিতে রূপান্তরিত করতে চেয়েছেন।
তবে ধর্মের আচারকারীরা ধর্মকে যখন ভুলভাবে চর্চা করে কিংবা ভুল ব্যাখ্যা দেয় তখন তিনি
ক্ষেপে উঠেন। তিনি তাই বলেন,
“তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লা – ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – তা’ হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুদার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু”!
যে খোদা আশিটি বছর তাঁকে না ডাকার অপরাধে এক বেলাও ঐ ভুখারীর খাবার বন্ধ করলেন না,
মোল্লা কোন অধিকারে পারেন এ কর্মটি – সেটিই ছিলো তার জিজ্ঞাসা। এটি ধর্মের ভুল চর্চা নয়
কি?
কিংবা,
জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া
হুকুর জল আর ভাতের হাড়ি ভাবলি এ তুই জাতির জান
তাইতো বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশ’ খান।
এখানেও তাঁর অবস্থান ধর্মের ভুল চর্চা বা বিভক্তির বিপরীতে।
এসবের ফলে কারো কারো ধারণা তাঁর অবস্থান ছিলো ধর্মের বিপরীতে। আর সেজন্য নানা অপবাদ
তাঁকে মাথা পেতে নিতে হয়েছে, যদিও এর অনেকটার জবাব তিনি দিয়েছেন তাঁর ‘আমার কৈফিয়ত’
কবিতায় –
“মৌ-লোভী যত মৌলভী আর মোল্লারা কন হাত নেড়ে,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
ধর্ম মানুষকে অপরাপর ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাতেও শেখায়, সকল ধর্মের সকল মতের
মানুষকে স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার দেয়। সামাজিকভাবে সকলের সমঅধিকার নিশ্চিত করে।
তবে বিধাতার চূড়ান্ত পুরস্কার বা শাস্তি কী হবে তা জানিয়ে দেয়। তাই বলে কখনো সামাজিক
বন্ধনে বিভক্তি রেখা টানে না।
নজরুল যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেন তখন তাতে ধর্মহীনতা থাকে না বরং থাকে
ধর্মচিন্তার প্রতিফলন। স্রষ্টা যেমন তাঁর আপন সৃষ্টিকে কোনভাবেই অবজ্ঞা করতে পারেন
না, এক সৃষ্টি তেমনি অপর সৃষ্টিকে কখনো অবজ্ঞা করতে পারে না বরং পরষ্পরের মধ্যে প্রগাঢ়
প্রেমের বন্ধন রচনার মাধ্যমে সম্প্রীতি বজায় রাখবে – এটাই স্বাভাবিক। আর এতেই রয়েছে
পারষ্পারিক অধিকার ও অপরাপর ধর্মের প্রতি সম্মানসূচক মনোভাব।
আর সামাজিক ঐক্যসচেতন নজরুল যখন ধর্মীয় বিবাদে লিপ্ত-বাস্তবতা দেখেন তখন সেই বিশেষ
প্রেক্ষিতের আঙ্গিকে বলে উঠেন,
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন্‌ জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে সন্তান মোর মার”।
কিংবা বলেন,
“গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ- মুসলিম-ক্রীশ্চান”।
এখানে তিনি কোনো সংকীর্ণতার পরিচয় দেননি বরং তিনি সামাজিক ঐক্য ও সৌহার্দ্য গড়ার
আহবান রেখেছেন।
এমনি তাঁর অজস্র লেখার মাধ্যমে আমরা যে চেতনায় প্রেরণাদীপ্ত হই তা হলো নানান সম্প্রদায়ে
মিলিত সুন্দর, সবাইকে এক করে দেয়া নয়। বাগানের ফুল ভিন্ন হলেই সুন্দর। কেননা একটি
বাগানে বৈচিত্রময় ফুলের সমাহারই বাগানটিকে করে তোলে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন।
প্রেমের কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি নজরুল যখন দেখেন সংকীর্ণতার কারণে সমাজে
বিভাজন সৃষ্টি হচ্ছে, তখনই তিনি ক্ষেপে উঠেন –
“ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া- দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!”
তার এ হুংকার ধর্মের বিপরীতে নয় বরং বিভাজন সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে। তাই তাঁর এ উচ্চকণ্ঠ
আমাদের প্রাণিত করে, আমাদের উদার হতে শেখায়।
এ ক্ষুদে আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নজরুল রচনা ধর্মীয় বিষয়ের প্রভাবমুক্ত
ছিলো না, তবে তাতে ঐক্যের আহবান ছিল, হীনমন্যতা ছিল না। তাঁর এই উদার মানসিকতার
মধ্যেই উপ্ত ছিল সামাজিক সংহতির বীজ, যা মহীরুহ হয়ে সমাজে প্রশান্তি বিস্তার করতে
সক্ষম।
এমন অনেক কবি লেখকই আছেন যাদের সাহিত্য পাঠ করলে মনে হয়, তাদের যেন আপন
ধর্মীয়গণ্ডি অতিক্রম করার অনুমতি নেই, যেটি নজরুলে দৃশ্যমান নয়। নজরুল সাহিত্যের ভাষা,
চেতনা ও উপলক্ষ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের অনুকূলে ছিলো বলেই তিনি নন্দিত হয়েছেন
ব্যাপকভাবে। শিল্প সে যে শ্রেণীভুক্তই হোক না কেন, তা সমগ্র সমাজকে ছুঁতে না পারলে
সর্বজনীন হতে পারে না। কোনো একক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের তৃষ্ণা নিবারণে সৃজিত সাহিত্য
অনেক বড় মাপের লেখক-কবিকেও খণ্ডিত করে ফেলে। তাছাড়া, সাহিত্যের ভিত্তি যদি
মানবজীবনের সুখ-দুঃখ ও সংগ্রাম-সাধনার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয় কিংবা সর্বসাধারণের রস-
পিপাসা নিবৃত্ত করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তা যেমন পারে না হতে পাঠকমনে গ্রথিত, তেমনি
পারে না হতে প্রেরণার উৎস। আবুল মনসুর আহমদ বুঝিবা সেজন্যেই বলেছেন, “মেজরিটি
দেশবাসীর সাথে নাড়ির যোগ না থাকিলে কেউ জাতীয় কবি হইতে পারেন না। বিশ্বের কাছে তিনি যত
বড়ই হউন”। নজরুলের প্রতিটি লেখায় সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছিলো বলেই
তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

নজরুল আমার সাহিত্য সাহিত্য সাধনা – আব্দুল মতিন জাকির, দেবিদ্বার, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একজন নজরুল সেনার  লেখা
নজরুল আমার সাহিত্য সাহিত্য সাধনা
– আব্দুল মতিন জাকির, দেবিদ্বার, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।
নজরুল আমার সাহিত্য সাধনা
আমার পল্লী গান,
নজরুল আমার ছন্দ কবিতা বিদ্রোহী,
সুরের ঐকতান।
নজরুল আমার ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালী আর মরমী গান,
নজরুল আমার অগ্নিবীণা বিষের বাঁশীর
মায়াবী টান.
নজরুল আমার ঝরা শিউলী সাপলা শালুক, আসানসোলের সেই রুটির দোকান।
নজরুল আমার চেতনা বৃক্ষ, রণসঙ্গীত
লালসবুজের ঐ নিশান
এিশালের সেই পাঠশালা আর সৃতিময় স্থান।
নজরুল আমার দৌলতপুর আর রমনার
সবুজ উদ্যান।
নজরুল আমার জাতীয় জীবনে
এক সরল উপাখ্যান।।

খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী

খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী — বিশ্ব-দুলালী নবী নন্দিনী,
মদিনাবাসিনী পাপতাপ নাশিনী উম্মত-তারিণী আনন্দিনী।।
সাহারার বুকে মাগো তুমি মেঘ-মায়া,
তপ্ত মরুর প্রাণে স্নেহ-তরুছায়া;
মুক্তি লভিল মাগো তব শুভ পরশে বিশ্বের যত নারী বন্দিনী।।
হাসান হোসেনে তব উম্মত তরে, মাগো
কারবালা প্রান্তরে দিলে বলিদান,
বদলাতে তার রোজ হাশরের দিনে
চাহিবে মা মোর মত পাপীদের ত্রাণ।
এলে পাষাণের বুকে চিরে নির্ঝর সম,
করুণার ক্ষীরধারা আবে-জমজম;
ফিরদৌস হ’তে রহমত বারি ঢালো সাধ্বী মুসলিম গরবিনী।।

হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়

হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়,
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায় —
সে যে আমার কমলিওয়ালা — কমলিওয়ালা।।
তার ভাবে বিভোল রাঙা পায়ের তলে
পর্বত জঙ্গম টলমল টলে,
খোরমা খেজুর বাদাম জাফরানি ফুল ঝ’রে ঝ’রে যায় —
সে যে আমার কমলিওয়ালা — কমলিওয়ালা।।
আসমানে মেঘ চলে ছায়া দিতে,
পাহাড়ের আঁসু গলে ঝরনার পানিতে,
বিজলি চায় মালা হতে,
পূর্ণিমার চাঁদ তার মুকুট হতে চায় —
সে যে আমার কমলিওয়ালা — কমলিওয়ালা।।

কেন প্রাণ ওঠে কাঁদিয়া

কেন প্রাণ ওঠে কাঁদিয়া
কাঁদিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া গো।
আমি যত ভুলি ভুলি করি, তত আঁকড়িয়া ধরি
শ্যামের সে রূপ ভোলা কি যায়, নিখিল শ্যামল যার শোভায়
আকাশে সাগরে বনে কান্তারে লতায় পাতায় সে রূপ ভায়।
আমার বঁধুর রূপের ছায়া বুকে ধরি’ আকাশ-আরশি নীল গো
বহে ভুবন প্লাবিয়া কালারে ভাবিয়া কালো সাগর-সলিল গো। সখি গো —
যদি ফুল হয়ে ফুটি তরু-শাখে, সে যে পল্লব হয়ে ঘিরে থাকে। সখি গো —
আমি যেদিকে তাকাই হেরি ও-রূপ কেবল
সে যে আমারি মাঝারে রহে করি’ নানা ছল
সে যে বেণী হয়ে দোলে পিঠে চপল চতুর।
সে যে আঁখির তারায় হাসে কপট নিঠুর।
তারে কেমনে ভুলিব, সখি কেমনে ভুলিব।
থাকে কবরী-বন্ধে কালো ডোর হয়ে কাল্‌ফণী কালো কেশে গো
থাকে কপালের টিপে, চোখের কাজলে কপোলের তিলে মিশে’ গো!
আমার এ-কূল ও-কূল দু’কূল গেল।
কূলে সই পড়িল কালি সেও কালো রূপে এলো।
রাখি কি দিয়া মন বাঁধিয়া, বাঁধিয়া বাঁধিয়া বাঁধিয়া গো।।

Categories

কেন প্রেম-যমুনা আজি হলো অধীর

কেন প্রেম-যমুনা আজি হলো অধীর
দোলে টলমল রহে না স্থির।।
মানে না বারণ উথলে বারি
ভাসালো কুললাজ রুধিতে নারি
সখি ডাক শুনেছে সে কার মুরলীল।।

তালঃ কাহার্‌বা

নাটকঃ ‘সিরাজদ্দৌলা’

Categories

তোমার কুসুম বনে আমি আসিয়াছি ভুলে

তোমার কুসুম বনে আমি আসিয়াছি ভুলে।
তবু মুখপানে প্রিয় চাহ মুখ তুলে।।
দেখি সে-দিনের সম, ওগো ভুলে-যাওয়া স্মৃতি মম
তব ও-নয়নে আজো ওঠে কি-না দুলে।।
ওগো ভুল ক’রে আসিয়াছি, জানি ভুলেছ, তুমিও
তবু ক্ষণেকের তরে সে-ভুল ভেঙো না প্রিয়।
তীর্থে এসেছি মম দেবীর দেউলে।।
তোমার মাধবী-রাতে, আসিনি আমি কাঁদাতে
কাঁদিতে এসেছি একা বিদায়-নদীর কূলে।।

Categories

কারার ঐ লৌহ কপাট

কারার ঐ লৌহ–কপাট
ভেঙ্গে ফেল্‌ কর্‌ রে লোপাট রক্ত –জমাট
শিকল –পূজার পাষাণ –বেদী!
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় –বিষাণ ! ধ্বংস –নিশান
উঠুক প্রাচী –র প্রাচীর ভেদি’।।

গাজনের বাজনা বাজা!
কে মালিক? কে সে রাজা? কে দেয় সাজা
মুক্ত –স্বাধীন সত্য কে রে?
হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান প’রবে ফাঁসি? সর্বনাশী —
শিখায় এ হীন্‌ তথ্য কে রে?

ওরে ও পাগ্‌লা ভোলা, দেরে দে প্রলয় –দোলা গারদগুলা
জোরসে ধ’রে হ্যাঁচকা টানে।
মার্‌ হাঁক হায়দরী হাঁক্‌ কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক ডাক ওরে ডাক
মৃত্যুকে ডাক জীবন –পানে।।

নাচে ঐ কাল –বোশেখী, কাটাবি কাল ব’সে কি?
দে রে দেখি ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি’।
লাথি মার, ভাঙ্‌রে তালা! যত সব বন্দী–শালায়–
আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা, ফেল্‌ উপাড়ি।।

Categories